Type to search

গল্প

মায়া

হায়দার সাহেব সকাল থেকেই লক্ষ করছেন তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী অর্পিতার মাঝে আজ কেমন যেন চাপা উত্তেজনা। অর্পিতা ব্যস্ত ভঙ্গিতে রান্না করছে। অল্পের জন্যে কড়াইয়ের গরম তেল তার হাতে ছিটকে পড়েনি। হায়দার সাহেব কারন জিজ্ঞেস করবেন ভেবেও করলেন না। তার দ্বিতীয় পক্ষের এই স্ত্রীটিকে জেরা করতে ভালো লাগে না। অর্পিতা স্বামী ভক্ত। এজন্যই নয় মাসের মধ্যে হায়দার সাহেবের মনে ভালো স্থান দখল করতে পেরেছে। হায়দার সাহেব বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক। কলেজের পর পুরো সময়টাই তিনি অর্পিতার সাথে কাটান।

অর্পিতা আহমেদ তার ছোট্ট মেয়ে সহীর জন্য দুদিন আগেই গিফট কিনে রেখেছেন। একটা প্রিন্সেস পুতুল। দোকানদার দাঁত বেরে হেসে বলেছিলেন, ম্যাম কিডসদের জন্যে এর চাইতে ভালো বার্থডে গিফট আর হয় না; জাপানি জিনিস, চাইনিস মাল দোকানে রাখি না।

আজ সহীর চতুর্থ জন্মদিন। হায়দার সাহেবকে বিষয়টা জানানো হয়নি। সহী এখন তার বাবা সরওয়ারের সাথে থাকে, অর্থাৎ অর্পিতার পূর্বের স্বামী। দুবছর আগে তাদের ডিভোর্স হয়। অর্পিতা অনেক চেষ্টা করেছে সহীকে তার সাথে রাখতে। মামলা হয়; কিন্তু আদালত সহীর বাবাকেই স্বীকৃতি দেয়। অর্পিতা অনেক কেঁদেছিলো মেয়ের জন্য। নয় মাস আগে হায়দার সাহেবের সাথে সংসার শুরু করার পর থেকে সে সহীকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু এই মায়া ভুলা কি এতো সহজ? মাঝ রাতে ঘুম ভাঙ্গলে অর্পিতা সহীর কান্নার শব্দ শুনার জন্য কান পেতে থাকে। পাশে ঘুমন্ত হায়দার সাহেবের নাক ডাকার শব্দ শুনা যায়।

মিসেস অর্পিতা আহমেদ তার ড্রয়ার খুলে গোলাপি কাগজে মোড়ানো পতুলের বাক্সটি বের করে। সহীদের নতুন বাসার ঠিকানা তার জানা নেই। অর্পিতা ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে। হায়দার সাহেব তার ক্লাসে চলে গেছেন। অর্পিতা গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে কোন নির্দেশ দেননা। ড্রাইভার নিজের মতো গাড়ি চালায়। গাড়ির গতীর সাথে পাল্লা দিয়ে অর্পিতা তার স্মৃতীতে হারায়। সহী যেদিন পৃথিবীতে আসে সেদিন ছিলো সোমবার। বৃষ্টি হয়েছিলো খুব… তারপর স্মৃতীগুলো অর্পিতার চোখদিয়ে জল হয়ে পড়ে, সেদিনের সেই বৃষ্টির মতো! অর্পিতা পার্স থেকে টিস্যু বের করে চোখ মুছে। ড্রাইভারকে বলে কাছাকাছি কোন বস্তিতে যেতে। ড্রাইভার অবাক চোখে তাকায় কোন কথা বলে না।

মরিয়মের বয়স সহীর মতই হবে। তবে অপুষ্টির কারনে তাকে আরো ছোট মনে হয়। মরিয়মের কোলে তারমতোই অপুষ্টিত কুকুর। কুকুরের নাম বাঘা। বাঘাকে বিড়ালের বাচ্চার মতো লাগছে। মরিয়ম খানিকটা ভয়ে ভয়ে অর্পিতা আহমেদের পাশে বসে আছে। অর্পিতা মরিয়মকে পুতুলটি দিতে চাইলে মরিয়ম নেয় না; বরং ভয়ে ভয়ে তাকায়। অর্পিতা মরিয়মকে আকৃষ্ট করার জন্য পতুলের বাক্সটার গোলাপি মোড়ক খুলে পায়ের কাছে থাকা সুইচ অন করে। পতুলটি তার যান্ত্রীক কন্ঠে গেয়ে উঠে “হ্যাপি বার্থ ডে, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ ডিয়ার…!” মরিয়ম হাত বাড়ায়। অর্পিতা আহমেদ মরিয়মের মাথায় হাত রাখে। সুহীর মতোই লালছে চুল। কি করছে সুহী এখন? রুক্ষ এলোমেলো লালচে চুলের মরিয়মকে বড় সুখী মনে হয় অর্পিতার।

জাহিদ রাজ রনি
প্রথম প্রকাশ: Organization for Humanity এর এর অনুরোধে লেখা। ২০১৫ সালে তাদের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।

শেয়ার করুন
Tags:

You Might also Like

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *