Type to search

সমসাময়িক

প্র্যাংক এর নামে এই হয়রানি বন্ধ হবে কবে?

ধরুন আপনি আপনার মা অথবা আপনার ছোট বোনকে নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটছেন, এমন সময় কেউ আপনার সামনে তার নিজের পরনের লুঙ্গিটি খুলে ফেলল, ব্যাপারটা কেমন হবে বলুন তো?

কিংবা ধরুন আপনার পরিবারের কেউ খুব অসুস্থ, অথবা ধরতে পারেন আপনার ক্লাসে বন্ধুটি খুব অসুস্থ, আপনি তাড়াহুড়ো করে হসপিটাল এ যাচ্ছেন তার দেখা করতে। সেই সময় কেউ এসে আপনার উপর এক বালতি পানি ঢেকে দিলো। ধরা যাক পানিটা পরিষ্কার, তবুও আপনার কেমন লাগবে বলুন তো?

কিংবা ধরা যাক বিকেলে নাইন-টেন পড়ুয়া ছোট বোনকে নিয়ে বিকেলে পার্কে গেছেন, আপনার আর আপনার বোনের বয়সের পার্থক্য চার-পাঁচ বছর। পার্কে ছোট বোনকে নিয়ে বসেছেন এমন সময় কিছু ছেলে এসে আপনাদের টিজ করা শুরু করলো। তারা এই ভেবেই কিছু নোংরা মন্তব্য ছুড়ে দিলো যে আপনারা একে অপরের প্রেমিক প্রেমিকা, নিজের ছোট বোনকে নিয়ে এসব নোংরা মন্তব্য কীভাবে নিবেন?

আরেকটা ঘটনা দিয়ে শেষ করছি, ধরেন আপনি একজন চাকুরিজীবী। আপনার সম্মান বাড়ানোর স্বার্থে ধরে নিলাম আপনি কোন এক মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ অফিসার। আপনার জরুরী মিটিং আছে। আপনার গাড়িটি নস্ট আর রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। হেলিকপ্টার নাই আপনার তাই হেটেই যাত্রা শুরু করলেন। আপনার মিটিং ঠিক দশ মিনিট পর শুরু হবে আর হেটে অফিসে যেতে বারো মিনিট লাগবে। মানে দুই মিনিট লস প্রজেক্ট, চাকুরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে। মাঝরাস্তায় কেউ এসে আপনার উপর এক গাদা পার্টি স্প্রে দিয়ে পালিয়ে গেল। আপনার মেন্টাল কন্ডিশান তখন কী হবে?

উপরের যে কয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা বললাম তার প্রায় প্রত্যেকটিই এখন বাংলাদেশে ডেইলি ঘটে চলেছে। তথাকথিত ইউটিউবার সম্প্রদায়ের কিছু উঠতি অশিক্ষিত ছেলেপেলে এইসব কাজ করে বেড়াচ্ছে ডেইলি। তাদের কাজ শুধু এইগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, আরো অনেক কিছু করে তারা রাতারাতি সেলিব্রেটি কিংবা পরিচিত মুখ হয়ে উঠার জন্য। সাথে ইউটিউব থেকে টাকা তো আসবেই।

আমি জিয়া উদ্দ্যানে যাইনা, কারনে সেখানে দিনের বেলাতেও অনেক অপ্রীতিকর ব্যাপার নিত্যই ঘটে। বান্ধবী কিংবা বোন নিয়ে গেলে টিজ করা, নোংরা কথা শোনা, ছিনতাই হওয়া থেকে বিভিন্ন ঘটনা সেখানে প্রতিদিনই ঘটে। সেইসব ছিনতাইকারি রাস্তার মানুষদের সাথে নতুন করে নাম লিখিয়েছে কতিপয় প্রাংকবাজ পোলাপাইন। এদের বেশিভাগের ঘরে টাকাপয়সার অভাব নাই, নাক চাপলে এখনো দুধ বের হবে এরকম বয়সের বাচ্চারাও আজকাল ডিএসএলআর কিনে প্র্যাংক ভিডিও বানাচ্ছে।

আমি বলছিনা প্র্যাংক বন্ধ করতে, ইউটিউব বন্ধ করতে। এন্টারটেইনিং এর দরকার অবশ্যই আছে, তবে সেটা সভ্যভাবে করলে কী হয়না? নাকি আমরা অসভ্য জাতী বলে সভ্য কাজ করতে পারিনা? প্র্যাংক শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো তামাশা বা কৌতুক করা। এইগুলা কোন ধরনের তামাশা রে ভাই? তামাশার আসল উদ্দ্যেশ্য হলো মানুষ হাসানো, আপনারা যা করছেন এইগুলো তো মানুষ কে হাসানোর বদলে ফাসাচ্ছে, কিছু কিছু মানুষ হয়রানির স্বীকার হচ্ছে। প্র্যাংক করেন, তবে সভ্য ভাবে করেন, অন্যের সমস্যা না হয় সেভাবে করেন। কি দরকার কিছু সাধারন মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে কিছু মানুষকে বিনোদন দেওয়ার? এসব দেখে তো হাসি পায়না। রাগ লাগে।

প্র্যাংক মানে এখন ইউটিউবে যা দেখা যায় তার বেশীরভাগই হলো মানুষকে বিড়ম্বনায় ফেলে মজা নেওয়া। আচ্ছা এই যে কাজগুলো করে বেড়াচ্ছেন তার ক্ষতিকর প্রভাবটা কতটা ভয়ানক হতে পারে ভেবে দেখেছেন?
আজ আপনি যে মানুষটার উপর একটা প্লাস্টিকে সাপ ছুড়ে মেরে তাকে প্রচন্ডভাবে ভয় খাইয়ে খিক খিক করে হাসছেন হতেও তো পারতো সেই মানুষটা হার্টের প্যাশেন্ট। সাপ দেখে ভয়ে হঠাৎ হার্ট এটাক করে ফেললেন কিংবা মারা গেলেন। তার দায়ভার কে নিবে? দুই টাকার জন্য প্র্যাংক করতে গিয়ে কাউকে মেরে ফেলা তো দন্ডনীয় অপরাধ। অবশ্য আপনারা যা করে বেড়াচ্ছেন তাও দন্ডনীয় অপরাধের চেয়ে কম কিসে?

সুস্থ একটা পরিবেশে সবাই থাকতে চায়। ঢাকায় নাই কোন ঘোরার জায়গা, নাই কোথায় একটু সবুজে ঘেরে বন। যা আছে তার সবই কালো ধোয়া, আর শব্দ। আর এসব থেকে বাচার জন্য স্কুল করে কিছু মেয়ে যখন পার্কে যায় আরাম করতে আপনারা তখন বখাটেদের মত তাদের উত্ত্যক্ত করা শুরু করেন। আপনারা কি জানেন এইসব কাজ কারা করে? এইসব ভিডিও চলে যায় সোস্যাল মিডিয়াতে, তাদের পরিবারের লোকজন ভিডিও দেখে, তাদের উপর প্রশ্নের শূল নিক্ষিপ্ত হয়, তাদের বাইরে ঘোরা ফেরা করার অধিকার কেড়ে নেয় পরিবার, তা হতে পারে আপনাদের মত বখাটেদের ভয়ে কিংবা অন্য কারনে। আপনাদের জন্য কিছু মানুষ বন্দী হয়ে গেল চার দেয়ালের মাঝে, কত দুর্বিষহ জীবন। এসবের দায়ভার কে নেবে?

বোটানিকাল গার্ডেনের কয়েকটা ভিডিওতে বিবাহিত দম্পত্তিকেও আপনারা নোংরা সম্পর্ক বলে তাদের যথেষ্ঠ অতিস্ট করেছেন।
এইসব প্লিজ বন্ধ করেন। বাংলাদেশের মানুষ এমনিতেই সবসময় ভয়ে তটস্থ থাকে নইলে রাগে ফুলে থাকে। এই ভয়ের মধ্যে আরো ভয় ঢুকিয়ে দিবেন না। কিংবা রাগী মানুষটাকে আরো রাগিয়ে দিবেন না, তারা রেগে গিয়ে আপনার না বরাবর একটা ঘুষি মারলে কী হবে ভেবে দেখেন? কিংবা ধরে নেন আপনার লাখ টাকা দিয়ে কেনা ক্যামেরাটাই ভেঙ্গে দিলো, কেমন লাগবে?

মিডিয়াতে কাজ করছেন, সুস্থ বিনোদন দিন। মানুষকে ডিস্টার্ব করবেন না প্লিজ। মানুষ হাসানোর আরো অনেক পন্থা আছে, সেগুলো ফলো করুন। বিদেশে যেসব প্র্যাংক হয় সেসব কপি করে এদেশে করলে ব্যাপারটা মোটেও ভালোর দিকে যাবেনা। কারন তাদের ট্রেন্ড আর আমাদের ট্রেন্ডের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *