Type to search

গল্প

পাপ

কোনো কোনো বিষন্ন দিনে মোসাম্মৎ ময়মুনা খানম সিদ্দিকা এখনো নক দেয়। যেমন ধরুন কোনো একদিন বিকেলের আকাশে লালচে যে একটা আভা হয়, যাকে বলে ‘কনে দেখা আলো’, ঐসব দিনে। আবার কোন সন্ধ্যায় যদি আমাদের নাগরিক জীবনে অনাহুত আগুন্তুকের মতো বৃষ্টি নামে তবে আমি বুঝি ময়মুনা খানম সিদ্দিকা আমাকে নক দিবে। আমি রিপ্লাই না দিলে কল দিবে। ঐসব ফোন কল এড়াতেই এইরকম অস্বাভাবিক দিনে আমি ফোনের কাছাকাছি থাকি। ময়মুনা খানম নানান গল্প করে। ঐসব গল্পের সারমর্ম থাকে, আমাকে ছাড়া তার জীবন কি দুর্বিষহ কাটছে সেইসব কষ্টের বর্ণনা।

– বুঝছেন, টিপ কিনতে গিয়ে তো কোনোটাই পছন্দ হয়না। শেষে ভাবলাম আপনার হেল্প নেই। পরে মনে হইলো আপনি তো এখন…

আমি বুঝি শেষের ওই তিনটা ফোটায় থাকে আমার প্রতি অবর্ণনীয় অভজ্ঞা, ঘৃণা, তাচ্ছিল্ল। তবে ভালোবাসাও হয়তো কোথাও একটু জমিয়ে রেখেছে ময়মুনা খানম, আর তাই এইসব দিনে তার নিজেকে আলাদা রাখার বাড়ন্ত চেষ্টার কাছে যেন সে হার মেনে যায়। তারপর নানান গল্পে গল্পে ময়মুনা খানম বলে, ‘জাদু! আমার লাল নীল সংসারটা আর হইলো না!’

আমি “হুম, কমপ্লিকেটেড” টাইপ একটা উত্তর লিখে পাঠাই। পাঠিয়ে আর্কাইভ দিয়ে ময়মুনা খানমের মেসেজটা হাইড করে ফেলি।

চোখের সামনে পূর্বে দেখা স্বপ্নের রেশ ধরে সংসার গড়তে চাইবার আকুতী কিংবা অপারগতা আমাকে আহত করে। আমার মাঝে পাপবোধ জন্ম নেয়। আমার মনে হয়, ময়মুনা খানমের সাথে কাজটা আমার ঠিক হলো না! নিজের ভেতরের এই পাপবোধটাই রোজ আমাকে মেরে ফেলে! আমি কুঁকড়ে যাই নিজের মাঝেই।

মোসাম্মৎ ময়মুনা খানম সিদ্দিকা হলো আমার নিঃসঙ্গ দিন গুলোর সঙ্গী। মৌরি আমাকে ছেড়ে যাবার পর যখন আমার কেউ ছিলো না, প্রচন্ড একা লাগতো, আমি তখন ময়মুনা খানমকে পাই। ওর সাথে গল্প করে নিঃসঙ্গতা কাটাই। বলি, আমরা একটা ছোট সংসার সাজাবো! অঞ্জন দত্তের বেলাবোস গান থেকে ময়মুনা খানম আমাদের সংসারের নাম দিয়েছিলো লাল নীল সংসার। ও লাজুক গলায় ফোনে গভীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়, ‘আমাদের সংসারে কি কি থাকবে?’ আমি এটা ওটার লিষ্ট করি। বলি, বিছানা বালিশ। বালিশের নিচে ধরো এক প্যাকেট…!

ময়মুনা খানম এতে লজ্জা পায়! তার ১৯ বছরের জীবনকে ঘিরে রাখে যে হিজাব, লম্বা বোরখা, নিকাব- তার মধ্যেই যেন আমি ঢুকে পড়ি!
খিলখিল করে হেসে ময়মুনা খানম বলে,
– আপনি নাহ!
– আমি কি?
– পঁচা লোক একটা!
– আচ্ছা যাও ঐটা থাকলো না। সেক্ষেত্র বিষয়টা বেশি রোমান্টিক হয় আরোও!

ময়মুনা খানম এতে লজ্জা পায়। আমাকে হাজারবার পঁচা লোক বললেও, দিন শেষে ঘুম আসার আগ পর্যন্ত ও আমাকে ভাবতো; আমি জানি! একটা সংসারের স্বপ্ন ও দেখতে শুরু করে। ওর গুছিয়ে রাখা রক্ষণশীল জীবনে আমি পাপের ইশারা দেখাই এক পবিত্র হাতছানিতে!

সেইসব জীবনে রোজ রাতে ময়মুনা খানম আমাকে বলতো, ‘চলো একটা কল্পনা করি!’

তারপর আমরা কল্পনা করি; কল্পনায় আমাদের সংসার হয়। সংসারে আমি ভুল বাজার করে আনি। পুঁইশাক বললে আমি ভুল করে কলমি শাক নিয়ে আসি! ময়মুনা খানম কোমরে হাত রেখে ঘাড় বাঁকা করে তাকায়, আমি ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে ওকে গভীর চুমু খাই! ময়মুনা খানম তখন ফোনে ব্যাকূল হয়ে উঠে। ওর নিশ্বাস গাঢ় হয়।

এই কল্পনার দিন গুলোতে আমার নিঃসঙ্গতা যখন কাটতে শুরু করে, আমি ধীরে ধীরে ময়মুনা খানমকে পুরোপুরি দখল করে ফেলি- তখনই এক বিকেলে মৌরি ফিরে আসে! এসে আমার জন্যে মায়া কান্না কাঁদে। সেই কান্না আমার পূর্বেকার প্রেম জাগিয়ে তুলে। আমি সব ভুলে বলি, ‘আমি জানতাম তুমি ফিরবা!’

তারপর ময়মুনা খানমকে দিয়ে ফেলা সকল কথা আমি ভুলে গিয়ে ঐসব কথাদেরই যেনো আবার সোপর্দ করে দেই মৌরিরি কাছে।

ময়মুনা খানমকে আমি ভুলে যাই। ইনবক্সে আনসিন হয়ে পড়ে থাকে ওর টেক্সট। তারপর জগৎ আমাকে শাস্তি দেয়। বছর না গড়াতেই মৌরি চলে যায়। সে যাওয়ায় আমি খুব বেশি কষ্ট পাইনা। আমার অনুভূতির যেনো ততদিনে ভোঁতা হয়ে পড়ে। আর ঐসব ভোঁতা অনুভূতির মাঝেই যেন সুঁই প্রবেশ করে এক বিদীর্ণ যন্ত্রনা নিয়ে, কোনো কোনো সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামলে, কোন মাঝরাতে ঘুম পালালে, বছরে দু’একবার-
‘জাদু রে! আমার লাল নীল সংসারটা?’…

জাহিদ রাজ রনি, ৬ এপ্রিল ২০২০

শেয়ার করুন
Tags:

You Might also Like

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *